বিজয় দিবসে কিশোর সেনার বিশ্বজয়
ওরা কিশোর। তবে ওদের খেলার মাঠ- প্রযুক্তি-উদ্ভাবন। এই মাঠেই কেশর ফুলিয়ে চলছে গত কয়েক বছর ধরেই। সবশেষ জীবন রক্ষাকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবনায় এবারের বিজয় দিবসেই বিশ্বজয় করেলো তারা। ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক উদ্ভাবনী বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা ওয়ার্ল্ড ইনোভেটিভ সায়েন্স সায়েন্স প্রোজেক্ট অলিম্পিয়াড-২০২৪ (উইসপো)-এ ওড়ালো লাল-সবুজের পতাকা। এদের একজন রাজশাহীর কামরুজ্জামান সরকারি ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী মো: ত্ব-সীন ইলাহি। অপরজন ঢাকার আগারগাঁওয়ের অধিবাসী সেন্ট জোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী জাবীর জারিফ আখতার। সেখানেই ত্ব-সীনের মা মোসা: মাসুমা আক্তারকে সঙ্গে নিয়েই আয়োজক কমিটির বিচারক প্রফেসর এরি হারদিয়ান এর হাত থেকে একটি স্বর্ণ ও আরেকটি রৌপ্য মেডেল গ্রহণ করেন এই কিশোর উদ্ভাবকেরা। বিশ্বকে উপহার দিলো নিরাপদ সড়ক এবং পনি বিষুদ্ধকরণ প্রযুক্তি। দুইটি প্রযুক্তিই তারা উদ্ভাবন করেছে নিজেদের খরচে। এমনকি বিশ্বজয়ী এই অভিযাত্রায় গিয়েছে বাবা-মায়ের জমানো টাকায়। প্রতিযোগিতার খোঁজ পেয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
ইন্দোনেশিয়ার শিক্ষামন্ত্রণালয় ও দেশেটির সায়েন্টিফিক সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে দেশটির পশ্চিমের জাভা প্রভিন্সের বেনডং নগরীতে ১৩ ডিসেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর বসেছিলো বিজ্ঞান-উদ্ভাবনের বৈশ্বিক আসর- উইসপো ২০২৪। এতে বিশ্বের ৩০টি দেশে থেকে অংশ নেন সহস্রাধিক প্রতিযোগী। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালোয়েশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, রোমেনিয়া, ইউক্রেইন, ফিলিপাইন ছিলো বাংলাদেশের সামনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পতাকা বহন করে আইস্পার্ক। এই দলের পক্ষ থেকে দুইটি উদ্ভাবন- অরাগার্ড ও হাইড্রো প্লাক্সমা এক্স প্রদর্শন করা হয়। প্রতিযোগিতায় শীর্ষ ৪৫টি দলকে পেছনে ফেলে প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি বিভাগে আইস্পার্ক এর অরাগার্ড স্বর্ণ পদক এবং পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে রৌপ্য জয় করে হাইডোপ্লাজমাই এক্স। স্বর্ণজয়ী অরাগার্ড প্রকল্পটির উদ্ভাবক মো: ত্ব - সীন ইলাহি। আর হাইড্রো প্লাজমা এক্স উদ্ভাবক জারিফ জাবির আখতার। প্রতিযোগিতায় তারা, সড়ক দুর্ঘটনা রোধী এবং পানি বিষুদ্ধকরণ ডিভাইস বানিয়ে দেখায়। প্রতিযোগিতায় বায়োনিক হাত বানিয়েও অরাগার্ড থেকে পিছিয়ে রৌপ্যজয় করে ইন্দোনেশিয়ার একটি দল। আর চালের আটা ও নারিকেল তেলের মিশ্রনে আর্গানিক সাবান বানিয়ে হাইডোপ্লাজমাই এক্স-কে বেঁধে ফেলে স্বাগতিক দেশেরই একটি দল।

অরাগার্ড
ইংরেজি aura অর্থ দেহজ্যোতি। শরীরের এই অলৌকিক আভার মতোই গাড়ির চালককে সুরক্ষিত রাখার একটি প্রকৌশল অরাগার্ড। এর ৫ বাই ৭ ইঞ্চির আয়তাকার বাক্সটির মাদারবোর্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয় সাতটি সেন্সর। ডিভাইসটিতে একটি সিপিইউ, ট্যাবলেট, টেকোমিটার, ক্যামেরা, ভাইব্রেটর ও লিডার ব্যবহার করা হয়। সিম দিয়ে ইন্টারনেট সংযুক্ত করে জিপিএস ব্যবহার করে গাড়ির সুরক্ষা-দুর্ঘটনার সব তথ্যই পাঠিয়ে দেয়া হয় মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। তাই ডিভাইসটি গাড়িতে লাগিয়ে রাখলে সেটি চালক ঝিমুনি দিতেই তাকে সতর্ক করার পাশাপাশি মালিকের কাছেও বার্তা চলে যাবে। একইসঙ্গে মাতাল হলে, অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়। লাইসেন্স স্ক্যান করে তবেই ইঞ্জিন চালু করার সুযোগ পাবেন চালক। আবার ফিটনেস টেস্ট রিনিউ না করলেও চলবে না চাকা। প্রতিযোগিতায় ডেমোনেস্ট্রেট করার সময় ‘আশে পাশে গাড়ি থাকলে কিংবা কুয়াশা থাকলে’ কী হবে প্রশ্ন রাখেন বিচারকেরা। জবাবে উদ্ভাবক ত্ব-সীনের উত্তর, ৩৬০ ভিউ লাইডার যুক্ত করে দিলেই সেই বাধাও অতিক্রম করা যাবে।

ডিভাইসটি প্রকৌশল নিয়ে বললেন, এই ডিভাইসটি মূলত অনেকগুলো সেন্সর একসাথে ইন্টিগ্রেট করে, এবং সিপিইউ সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয় এবং ড্রাইভারকে রক্ষা করে। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্টস অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ড্রাইভার দ্বারা সৃষ্ট বিভিন্ন ভুলের সমাধান প্রদান করে এবং সড়কে সবাইকে নিরাপদ রাখে। ডিভাইসটি তৈরিতে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকার মতো। তবে বাণিজ্যিকভাবে ২৫ হাজারের মধ্যেই সম্ভব বলে জানালো সে। ত্ব-সীনের বাবা মোঃ ইসহাক আলী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার। বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণাতেই গবেষণা ও উদ্ভাবনায় অনুরক্ত হয়েছেন স্কুল জীবনেই। উদ্ভাবনায় এর আগেও মালোয়েশিয়া থেকে স্বর্ণ পদক জিতেছে সে।

হাইডোপ্লাজমাই এক্স
ডিভাইসটি ছোট একটা কলমের সমান। এর মাধ্যমে মূলত পানিতে হাই ভোল্টেজ প্লাজমা প্রযুক্তি ব্যবহার করে উচ্চ ভোল্টেজে বিবর্জিত শকওয়েভ তৈরি করে জীবাণু ধ্বংস করা হয়। রাশিয়া-ইউক্রেইন ও ফিলিস্তিনে সুপেয় পানির অভাব মেটানোর চিন্তা থেকেই ডিভাইসটি উদ্ভাবন করেন সেন্ট জোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাবীর জারিফ আখতার। ডিভাইসটির মাধ্যমে মূলত ব্যাটারি বা ডিসি পাওয়ার সোর্স থেকে দিক পরিবর্তনশীল তরঙ্গ তৈরি তথা একটি সুইচিং সার্কিট ব্যবহার করে এসি কারেন্টে রূপান্তর করা হয়। এরপর রূপান্তরিত এসি কারেন্টকে উচ্চ বিভবে বিবর্ধিত করার জন্য ট্রান্সফরমার ব্যবহার করা হয়। এর ফলে উৎপন্ন কৃত উচ্চবিভব পানিতে শকওয়েভ জেনারেট করে যা পানিতে বিদ্যমান বিভিন্ন বায়োলজিক্যাল কন্টামিনেন্ট যেমন ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস ইত্যাদির কোষ প্রাচীর ভেদ করে নিউক্লিয়াস এ অবস্থিত ডিএনএ, আরএনএ এর বন্ড ভেঙে এগুলোকে ধ্বংস করে এছাড়াও বিভিন্ন জৈব পদার্থের ডাবল, ট্রিপল পাই বন্ধন ভেঙে পানিকে পরিশোধন করে। তবে এই কাজটি করতে সময় লাগে মাত্র ৩ থেকে ৫ সেকেন্ড।
খরচ জানতে চাইলে চমকপ্রদ তথ্য দিলেন জারিফ। বললেন, ডিভাইসটি যদি আমরা বাজার থেকে সরাসরি কেনা প্রোডাক্ট দিয়ে তৈরি করি তাহলে এর খরচ ৭ থেকে ৮ ডলার আর ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে তৈরি করলে দেশ ভেদে এর খরচ সাড়ে তিন থেকে পাঁচ ডলার। অর্থাৎ তার উদ্ভাবিত পানিবিষুদ্ধকরণ যন্ত্রটি কেবল পানি শোধনই করে না, ই-বর্জ্য থেকেও পরিবেশকে নিরাপদ রাখতে সহায়ক। ডিভাইসটি বানানোর ক্ষেত্রে বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকর্তা বাবা বাবুল আখতারের কথা জানালো সে। আর সরকারি কর্মকর্তা মা ফারহানা শওকতের অনুপ্রেরণায় ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে গবেষণা শুরু তার। আর কোভিডের অখন্ড অবসর তাকে এনে দিয়েছে সফলতা। বললেন, বিজ্ঞানিক কল্পকাহিনী পড়তে নিকোলা টেসলা’র সঙ্গে পরিচয়। স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগেই ইলেকট্রিনিক্স যন্ত্র নিয়ে খেলা শুরু। তখন থেকেই বিজ্ঞান মেলায় অংশ নেই। এর আগে সুইডেনে স্টকহোম জুনিয়র ওয়াটার প্রাইজ পেয়েছি। এখন তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের স্যাটেলাইট প্রকল্প নাসা গ্লি মিশনের ট্রেইনি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিযুক্ত।
এই দুই কিশোরের জোড়া পদক নতুন প্রজন্মকে নতুন বাংলাদেশে উদ্ভাবন আর আলোকময় ভবিষ্যতের পথ দেখাবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এজন্য তাদের এই উদ্ভাবন নেশা, অনুশীলন অব্যহত রাখতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেতন থাকা দরকার বলে মনে করেন তারা।







